বুধবার, ৩০ নভেম্বর ২০২২, ১২:৪৯ পূর্বাহ্ন

দুই হাত হা‌রি‌য়েও সা‌কিরু‌লের আয় লাখ টাকা
জাহিদ মাহমুদ মেহেরপুর প্রতিনিধি / ১৮৩ ভিউ
সর্বশেষ আপডেট : বুধবার, ৩০ নভেম্বর ২০২২

অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর কঠোর অধ্যবসায় মানুষকে নিয়ে যেতে পারে উন্নতির চরম শিখরে। হতে পারে সমাজের অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। তেমনি পঙ্গুত্বকে জয় করে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন দুই হাত হারানো সাকিরুল ওরফে সাকুল। পারিবারিক ও প্রতিবেশীদের সহযোগিতায় তিনি গড়ে তুলেছেন ছাগলের খামার। সাকিরুল মেহেরপুরের গোপালপুর গ্রামের জামাত আলীর ছেলে। সাকিরুলের বয়স যখন ১০ কিংবা ১২। আর দশটা ছেলের মতোই সাকিরুল ছিল বেশ চটপটে ও দুরন্ত। দুরন্তপনা আর খেলাধুলায় মেতে থাকত সারাক্ষণ। বন্ধুদের সঙ্গে খেলার ছলে সাকিরুল বাড়ির বৈদ্যুতিক খুঁটিতে উঠে হাত দেয় বৈদ্যুতিক তারে। এতেই ঘটে বিপত্তি। দুটি হাতই ঝলসে যায়। অনেক চিকিৎসার পরও কোনো উন্নতি না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত দুটি হাত কেটে ফেলতে হয়। দুটি হাত হারিয়ে সাকিরুল হয়ে পড়েন কিংকর্তব্যবিমূঢ়। সাকিরুলের সঙ্গে তার পরিবারেও নেমে আসে হতাশা। অনেকেই সাকিরুলকে অন্যের দ্বারে হাত পেতে সাহায্য চাওয়ার পরামর্শ দেন। কিন্তু এ পরামর্শ মানতে নারাজ সাকিরুল ও তার বাবা-মা। হাত হারালেও সাকিরুলের বুদ্ধিমত্তা ছিল প্রখর। এটা বুঝতে পেরে স্থানীয় এক স্কুলশিক্ষক তাকে পরামর্শ দেন ছাগল পালন করার। সেই থেকে শুরু সাকিরুলের ছাগল পালন। তার বাবা তাকে প্রথমে পাঁচটি ছাগল কিনে দেন। হাত ছাড়াই ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা শুরু করেন। আস্তে আস্তে রপ্ত করে ফেলেন ছাগল চরানো। এদিকে ক্রমেই বাচ্চা দিতে থাকে সাকিরুলের ছাগি। বাড়তে থাকে ছাগলের সংখ্যা। সেই থেকে আর কারও করুণা দরকার হয়নি তার। এখন অন্যের কাছে হাত পাততে হয় না সাকিরুলকে। বর্তমানে তার খামারে ছাগলের সংখ্যা অর্ধশতাধিক। মা ছাগল রয়েছে প্রায় ২৫টি। বছরে দুবার দুই থেকে তিনটি করে বাচ্চা দেয় একটি মা ছাগল। ছাগল বিক্রি করে বছরে আয় হয় লক্ষাধিক টাকা। এতে ভালোই চলে তার সংসার। ব্যতিব্যস্ততার শেষ নেই সাকিরুলের। সকাল থেকে সারাদিন মাঠে ছাগল চরান। মাঠের ঘাস খাওয়ানোর কারণে তার ছাগল পালনে তেমন বাড়তি খরচ নেই বললেই চলে। তবে কোনো কোনো সময় বিচালি আর ধানের গুঁড়া খাওয়ানো হয়। সাকিরুল প্রতিবছর ছাগল বিক্রি করে আয় করেন এক থেকে দেড় লাখ টাকা। তিনি তার ইচ্ছাশক্তি দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন, ছাগল পালন করেও বছরে লাখ টাকা আয় করা সম্ভব। সংসারজীবনেও সাকিরুল একজন সুখী মানুষ। প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে জেগে ব্রাশ করানো, গোসল করানো মুখ ধুয়ে দেওয়া থেকে শুরু করে মুখে তুলে খাওয়ানোর কাজটাও করে দেন তার স্ত্রী তারিফা খাতুন। সাকিরুলের মা বুলুজান বলেন, মায়ের কষ্টটা অনেক বেশি। ছয় ছেলে-মেয়ের মধ্যে সাকিরুল ছোট। এ পর্যন্ত তাকে নিয়ে কষ্টের শেষ নেই। সব ছেলে-মেয়ের চেয়ে সাকিরুলকে নিয়ে সব সময় ভাবনায় থাকতে হতো। তবু প্রাণে বেঁচে আছে। আলহামদুলিল্লাহ, সে এখন অন্যের সহযোগিতা ছাড়াই ছাগল পালন করে সংসারে উন্নতি করছে। স্ত্রী তারিফা খাতুন আর দুই মেয়ে সাদিয়া ও সামিয়াকে নিয়ে বেশ সুখে আছেন সাকিরুল। তারিফা জানান, স্বামীর দুটি হাত না থাকলেও তার অদম্য বাসনা রয়েছে। সংসারে ভালোবাসার কমতি নেই তাদের মাঝে। আর দশজন গৃহিণীর মতো তারাও বেশ সুখী। কোনো হতাশা নেই তাদের মাঝে। প্রতিদিন স্বামীকে গোসল দেওয়া, পোশাক পরিয়ে ছাগলের পাল নিয়ে মাঠে বের করে দিয়ে আবার বাড়ি ফিরে আসার অপেক্ষায় থাকতে হয়। বেশ ভালোই লাগে তার। প্রতিবেশীরা বলেন, একসময় যারা সাকিরুলকে অন্যের সাহায্য চাওয়ার জন্য পরামর্শ দিয়েছিলেন, তারা আজ নিজেদের অপরাধী মনে করেন। সাকিরুলের এই সাফল্য দেখে নিজেরাও উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন। তারা জানান, অঙ্গহীন সাকিরুল নিজেকে যেভাবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, তা সত্যিই অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। তাকে দেখে অনেকেই শুরু করেছেন ছাগল পালন। আমঝুপি ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সদস্য বদরউদ্দীন জানান, সাকিরুলের সংগ্রাম আমাদের সমাজের জন্য দৃষ্টান্ত। দুটি হাত না থাকলেও তিনি তার পরিবার নিয়ে সুন্দরভাবে জীবন যাপন করছেন। আমরা যতটুকু পেরেছি তাকে সহযোগিতা করেছি। আমঝুপি ইউপি চেয়ারম্যান চুন্নু মিয়া বলেন, সাকিরুল আমাদের জেলার একটি উজ্জীবিত ব্যক্তি। আত্মশক্তিতে বলীয়ান হয়ে তিনি ছাগল পালন করে প্রতিবছর লাখ টাকা আয় করেন। তার দেখাদেখি অন্যরাও ছাগল পালন করে সাবলম্বী হচ্ছেন। সাকিরুলের পরিবারকে আমি পরিষদ থেকে নানাভাবে সহযোগিতা করে আসছি। তবে তার খুব বেশি প্রয়োজন হয় না। তিনি নিজেই এখন অন্যকে সহযোগিতা করেন। মেহেরপুর জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মোহাম্মদ সাইদুর রহমান বলেন, ছাগল পালনে সাকিরুলকে প্রাণিসম্পদ থেকে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দেওয়া হয়। ছাগলের রোগ প্রতিরোধে মাঝেমধ্যেই খোঁজ নেওয়া হয়ে থাকে। আমাদের পক্ষ থেকে তার প্রতি আলাদা দৃষ্টি রয়েছে। এরপরও যদি কোনো প্রয়োজন হয়, তাহলে যেকোনো সমস্যায় সহায়তা করা হয়। মেহেরপুর জেলা প্রশাসক ড. মুনসুর আলম খান বলেন, সরকারি সব ধরনের সুবিধা শারীরিক প্রতিবন্ধী সাকিরুলকে দেওয়া হয়। তবে সে জেলার একটি আইকন। বিভিন্ন মহলের সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে। সাকিরুল আমাদের সহযোগিতা চাইতে পারে। আমরা তার পাশে আছি।

আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published.

More News Of This Category
জনপ্রিয়
সর্বশেষ