বুধবার, ১৭ অগাস্ট ২০২২, ০৭:২১ অপরাহ্ন

ফুলবাড়িতে লিচু বিক্রি করে সাবলম্বী আজিজুল
মোঃ নাসিরুল ইসলাম ফুলবাড়ী (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি / ২৩৩ ভিউ
সর্বশেষ আপডেট : বুধবার, ১৭ অগাস্ট ২০২২

অতিকষ্টকে পরাজিত করে নিজ চেষ্টায় স্বাবলম্বী হওয়া যায় এমন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলা সদরের পানিমাছকুটি কদমতলা গ্রামের ফল বিক্রেতা আজিজুল হক (৫০)।

আজ থেকে প্রায় ৩৬ বছর আগে আজিজুল হক ছিলেন একজন কষ্ট বুকে লালন করা মানুষ। দিনে দু’বেলা ভাত জুটতানা তার। পরিবারে বাবা, মা, স্ত্রী-সন্তান মিলে মোট ৯ সদস্যের মুখে আহার তুলে দিতে তাকে দিনমজুরী দিতে হতো।

যখন দিনমজুরী দেয়া সম্ভব হতোনা তখন বাদামের ডালি গলায় জড়িয়ে পথে প্রান্তরে বিক্রি করতে হতো দুই/এক টাকার বাদাম। বাদাম বিক্রি করে যা আসতো তা দিয়েই চাল-ডাল কিনে বাড়িতে আসতে হতো তাকে।

কখনও বাদাম, কখনও কটকটি আবার কখনও বা বিষ-ব্যাথার মলম বিক্রি করে জীবন চালাতে হতো তাকে। পরিবারের ৯ সদস্যকে নিয়ে এভাবে অতিকষ্ট করে জীবন চালানোর মধ্য দিয়েই প্রায় ২৮ বছর কেটে যায় আজিজুলের।

এরমধ্যে গত ৮/১০ বছর আগে ফুলবাড়ীতে লিচুর কদর কম থাকায় এলাকার কিছু লিচুর গাছ মালিক তাদের গাছের লিচু পেরে বাজারে বিক্রির করার জন্য আজিজুল হককে বলেন। তাদের কথা মতো আজিুল গাছ থেকে লিচু পেরে বাজারে পসরা সাজিয়ে লিচু বিক্রি শুরু করেন।

ওই সময় প্রতি ১০০ টি লিচু ২০-৩০ থেকে সর্বোচ্চ ৪০-৫০ টাকায় বিক্রি হতো । যা বিক্রি হতো নিজের পারিশ্রমিক নিয়ে বাকি টাকা বাগান মালিকদের দিতেন আজিুল। পরবর্তীতে আজিজুল একটি বাগানের লিচু ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায় কিনে নিজেই বাজারে লিচু বিক্রি শুরু করেন। বাজারে আজিজুলের লিচুর পসরা থেকে শুরু হয় এখানকার মানুষের মাঝে লিচু কেনাবেচা। আসতে আসতে লিচুর চাহিদাও বেড়ে যায় মানুষের মাঝে। দিনদিন লিচুর দাম বেড়ে যাওয়ায় আজিজুল লিচু বিক্রির মাঝে খুঁজে পান মুনাফার পথ।

আগে দুই/একটি লিচু বাগান কেনার সামর্থ থাকলেও আজিজুল এখন একাধিক বাগান কিনছেন। ওই সময়ে প্রতি ১০০ লিচুর মূল্য ২০-৩০ থেকে সর্বোচ্চ ৪০-৫০ টাকায় বিক্রি হলেও এখন আজিজুল দেশীয় জাতের প্রতি ১০০টি লিচু বিক্রি করছেন ১০০ থেকে ১৫০ টাকায়।

এছাড়া লিচু মৌসূমের শেষে উন্নত জাতের প্রতি ১০০টি লিচু আজিজুল বিক্রি করেন ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত। আজিজুলের প্রতি লিচু মৌসূমে কম পক্ষে ৮/১০ টি বাগান কেনা থাকে। এসব বাগানের মধ্যে চায়না-১, চায়না-২, বোম্বাই, মাদ্রাজী ও কাঁঠালি জাতের লিচু থাকে। ফল বিক্রেতা স্বাবলম্বী আজিজুল হক জানান, জন্মস্থান লালমনিরহাট জেলা সদরের মদনের চর গ্রামে। আজ থেকে প্রায় ৩৮ বছর আগে আমি বাড়ি ছেড়ে ফুলবাড়ী উপজেলার সদরের পানিমাছকুটি কদমতলা গ্রামে আসি।

এখানে এসে আব্দুল জব্বার ম্স্ত্রিীর মেয়ে জরিনা বেগমকে বিয়ে করি। বিয়ের দুই বছর পর আমি স্ত্রীর ভোরণ পোষেণের জন্য দিনমুজুরী দেই। কখনও দিনমজুরী, কখনও বাদাম বিক্রি, আবার কখনও বিষ-ব্যাথার মলম বিক্রি করে অতিকষ্টে দীর্ঘ ২৮ বছর পারি দেই। এই সংসারে আমার মা-বাবা,স্ত্রী-সন্তান মিলে ৯ জন সদস্য ছিল। অতি কষ্টের মাঝে এই সদস্যের খাবারের ব্যবস্থা করা করতে হতো। গত প্রায় ৮ বছর পর আগ থেকে আমি অতিকষ্টকে পরাজিত করেছি। আল্লাহর রহমতে লিচু ও লটকন আমাকে কষ্ট থেকে স্বাবলম্বী করে দিয়েছে।

আজিজুল হক আরও বলেন, আগে ফুলবাড়ীর বাজারে লিচুর কদর ছিলনা। মানুষ বাজারে লিচু বিক্রির কায়দা কানুন জানতোনা। এলাকার কিছু লিচু গাছ মালিক আমাকে তাদের লিচু গাছ থেকে পেরে এনে বাজারের বিক্রির জন্য বললে আমি ফুলবাড়ীতে লিচু বিক্রির কাজ প্রথম শুরু করি। সেই থেকে এখানে লিচু কেনাবেচা শুরু হয়। পরবর্তীতে লিচুর চাহিদা বাড়লে আমি গাছ মালিকদের কাছ থেকে কম দামে লিচু কিনে এনে বাজারে খুচরা দরে বিক্রি করে লাভবান হই। এভাবে দিনে দিনে আমি বিভিন্ন এলাকা থেকে লিচুর গাছ ও লিচুর বাগান কেনা শুরু করি।

এখন লিচুর মৌসূমে আমি ৮/১০ টি করে বাগান কিনছি। একটি করে বাগান ৩০ থেকে ৫০ হাজার টাকা দিয়ে কিনতে হচ্ছে। এসব বাগান থেকে খুচরা ও পাইকারী দরে লিচু বিক্রি করছি। চায়না-১. চায়না-২ জাতের প্রতি ১০০ টি লিচু ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা। বোম্বে জাতের লিচু প্রতি ১০০ টি বিক্রি হচ্ছে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা ও মাদ্রাজী ও দেশীয় জাতের লিচু প্রতি ১০০ টি বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে ১৫০ টাকায়। খুচরা দরে স্থানীয় বাজারে মাদ্রাজী ও দেশীয় জাতের চাহিদা বেশি বলে জানান আজিজুল হক।

আজিুল হক বলেন, আমি প্রতি বছর লিচুর মৌসূমে লিচু বিক্রি করে আয় করছি শ্রমিক খরচ বাদ দিয়ে প্রায় ২ লাখ টাকা। লিচু বিক্রির পর লটকন বিক্রিতেও আয় হয় দেড় থেকে ২ লাখ টাকা। এছাড়াও শীত মৌসূমে ভাপা পিঠা বিক্রি করে আয় করি প্রায় ২ লাখ টাকা।

তিনি বলেন, আমি আল্লাহর রহমতে এখন একজন স্বাবলম্বী মানুষ। আমার এই উপার্জন থেকে আমি বড় ছেলে জুয়েল হোসেনকে, ছোট ছেলে আব্দুল আউয়ালকে ও একমাত্র মেয়ে আদুরী খাতুনকে লেখা পড়া শিখিয়েছি। এরা ভালো পর্যায়ে না গেলেও আমার মতো অজ্ঞ না হয়ে অক্ষর জ্ঞান শিখেছে। এর মধ্যে বড় ছেলে জুযেল হোসেনকে বিয়ে দিয়েছি। ছোট মেয়ে আদুরীকে সোনাদানা দান- দক্ষিণা দিয়ে বিয়ে দিয়েছি। ১৮ শতাংশ বসতভিটা কিনেছি। ফলের ব্যবসা করার জন্য ফুলবাড়ী বাজারে ২ লাখ ১০ হাজার টাকা দিয়ে একটি দোকান ঘর কিনেছি। ছেলেরা আমার ব্যবসায় সহযোগিতা করছে।

আজিজুল হক আরও বলেন, আমার স্বাবলম্বী হওয়ার পিছনে ভূমিকা রেখেছে আমার সদ্য প্রয়াত স্ত্রী জরিনা বেগম। জরিনা বেগমের লিভার ক্যান্সার হলে বাংলাদেশ ও ভারতে চিকিৎসা করেছি এই লিচু ও লটকন বিক্রির উপার্জনের টাকায়। এতে প্রায় ১৩ লাখ টাকার খরচ হয়। স্ত্রীর কুলখানিতেও ৪০ হাজার খরচ হয়েছে। আজিজুল হকের মতে, নিজের ইচ্ছা শক্তি কাজে লাগিয়ে ধৈর্য ও পরিশ্রম করে গেলেই অতিকষ্টকে পরাজিত করে নিজেকে স্বাবলম্বী করা যায়। তিনি এই ইচ্ছা শক্তিকে কাজে লাগিয়ে নিজেকে স্বাবলম্বী করে আজ পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের নিয়ে সুখেই আছেন বলে জানিয়েছেন।

আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published.

More News Of This Category
জনপ্রিয়
সর্বশেষ