বুধবার, ১৭ অগাস্ট ২০২২, ০৭:৪৭ অপরাহ্ন

রথযাত্রা ও তার ইতিহাস
সুশান্ত মণ্ডল, খুলনা / ৩০৫ ভিউ
সর্বশেষ আপডেট : বুধবার, ১৭ অগাস্ট ২০২২

রথযাত্রার কথা বললেই  মনে হয় হাজার হাজার ভক্তের রথ নিয়ে যাত্রা। ভক্তরা জগন্নাথদেব ও সুভদ্রা ও বলরাম কে নিয়ে রথে বসিয়ে তাদের মাসির বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছে । হরিনামের মুখরিত হচ্ছে চারিদিক এমন ছবি আমাদের চিরচেনা। কিন্তু এবারের রথযাত্রা হয়তো একটু ব্যতিক্রম হবে। কারণ সারা পৃথিবী করোনা মহামারীতে জর্জরিত। ভারত তথা পৃথিবীর সর্ববৃহৎ পুরীর রথযাত্রা ২৮৪ বছরের মধ্যে এই প্রথম বন্ধ রাখতেন ভারতের সুপ্রিম কোর্ট আদেশ দিয়েছে তাহলে বোঝাই যাচ্ছে পৃথিবীর কেমন অবস্থা।

উৎসব তো দূরের কথা আমাদের দেশে এখন চলছে কঠোর লকডাউন। এবছর সোজা রথ ১২ জুলাই এবং উল্টো রথ ২০ জুলাই হবে।

কবিগুরুর ভাষায় রথযাত্রা কেমন ছিল একটু দেখি –

“ রথযাত্রা, লোকারণ্য, মহা ধুমধাম,

ভক্তেরা লুটায়ে পথে করিছে প্রণাম।

হদ ভাবে আমি দেব’ রথ ভাবে আমি,’

মূর্তি ভাবে মূর্তি ভাবে  আমি দেব হাসে অন্তর্যামী।” 

এখন আমরা রথ যাত্রার ইতিহাস সম্পর্কে জানব।  এর ইতিহাস জানতে হলে আমাদেরকে ফিরে যেতে হবে মালবদেশ বা বর্তমান উড়িষ্যা নামে পরিচিত রাজ্যে। রাজা ছিল ইন্দ্রদ্যুস্ন। তার হাত ধরেই রথ যাত্রার সূচনা হয়েছিল।

পদ্মপুরাণ এর বর্ণনা পাওয়া যায় এই রাজার হাত ধরে রথ যাত্রার ইতিহাস। তখন সত্যযুগ, দেশের রাজা  ইন্দ্রদ্যুস্ন  ছিলেন শ্রী হরি বিষ্ণুভক্ত। গড়ে তুলেছিলেন জগন্নাথ ধাম তথা শ্রী ক্ষেত্র নামের পবিত্র মন্দির। কিন্তু মন্দিরে ছিলনা কোন বিদ্রোহ। একদিন এক সন্ন্যাসী আগমন ঘটে রাজপ্রাসাদে। রাজার সেবাযত্নে তুষ্ট হয়ে তাকে বললেনঃ নীলমাধব  শাবরদের  মাধ্যমে  পূজিত হতে চান। শাবরদের  বাস ছিল নীল পর্বত এর ধারে। সন্ন্যাসীর কথা শুনে নীল মাধবের দর্শনের জন্য ব্যাকুল হয়ে গেলেন রাজা। তখন তিনি ডেকে পাঠালেন  তার পুরোহিতের ভাই বিদ্যাপতি কে শরবদের দেশে গিয়ে খুঁজে আনতে বললেন নীলমাধবের মূর্তিকে।

আদেশ অনুযায়ী বিদ্যাপতি গেলেন শবররাজ বিশ্ববসু এর নিকট, সেখানে একবার জঙ্গলের মাঝে বিদ্যাপতি পথ ভুলে যায়। তখন তাঁকে উদ্ধার করেন বিশ্ববসুর  ললিতা। যা হবার তাই হলো, বিদ্যাপতি ললিতার প্রেমে পড়ে গেল।   তারপর রাজা দুজনের বিয়ে দিয়ে দিলেন। কিন্তু বিদ্যাপতির মাথার মধ্যে নীলমাধব এর দর্শনের চিন্তা সে প্রথম থেকেই ঘুরপাক খাচ্ছিল। সে অনেক বলে কয়ে ললিতা কে রাজি করালো নীল মাধবের দর্শন করানোর জন্য কিন্তু ললিতার শর্ত ছিল যে তিনি বিদ্যাপতি কে চোখ বেঁধে নিয়ে যাবেন। বিদ্যাপতি গেলেন চোখ বেঁধে কিন্তু সাথে করে নিয়ে গেলেন যব এর  দানা। যাবার পথে ললিতার অবসরে তিনি সেই দানা ফেলতে ফেলতে গেলেন চিহ্ন হিসেবে। নীল  পর্বতে গিয়ে নীলমাধব এর দর্শন পেয়ে বিদ্যাপতি ধন্য হলেন। তারপর তিনি খবর পাঠালেন রাজা ইন্দ্রদ্যুস্নের কাছে।রাজা তার রথ, সৈন্য নিয়ে এলেন নীলমাধব কে নিয়ে যেতে। কিন্তু শ্রী হরি লীলা বোঝা বড় দায়। রাজা পৌঁছে গিয়ে দেখলেন যে মন্দিরে নীলমাধবের বিগ্রহ নেই। যদিও এ নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে কোথাও বলা হয় নীলমাধব নিজেই লীন হয়ে যান, আবার কেউ বলে থাকেন যে শবরেরা  নীলমাধব এর বিগ্রহ লুকিয়ে রেখে দেয়। এতদূর এসেও  রাজা নীলমাধব কে দেখতে না পেয়ে হতাশ হয়ে সিদ্ধান্ত নেন যে  এ জীবন তিনি আর রাখবেন না। ঠিক এই সময় আকাশ থেকে দৈববাণী শোনা যায়-

“ সমুদ্রের জলে ভেসে আসবে দারুব্রহ্ম কষ্ঠ,

সেই কাষ্ঠ খন্ড থেকেই তৈরি হবে বিগ্রহ”

( অর্থাৎ নীলমাধবের বিগ্রহ)

এরপর রাজা চলে আসেন তার নিজ রাজ্যে। হঠাৎ এক রাত্রে রাজা স্বপ্নে দেখলেন, ভগবান শ্রীহরি তাকে বলছেন-

“ আমি সমুদ্রে ভাসতে ভাসতে তোমার নিকট আসছি।

 পুরীর বাঙ্কিমুহান  নামক স্থানে তুমি আমাকে দারুব্রহ্ম রূপে পাবে।”

রাজা সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে সেই স্থানে গিয়ে দেখতে পেলেন এক খন্ড কাঠের টুকরা। হাতি সৈন্য নিয়েও সেই কাঠ নড়ানো গেল না। শ্রী হরি স্বপ্নাদেশে খবর পাঠানো হলো শবরাজ বিশ্ব বসুকে। তিনি আসার পর বিদ্যাপতি, রাজা ও বিশ্ব বসু  এই তিনজনে মিলে সেই কাঠের টুকরা নিয়ে এলেন রাজার প্রাসাদে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো সেই কাঠ খোদাই করার মত ক্ষমতা কারোরই ছিল না ঐ রাজ্যে।  হাতুড়ি দ্বারা খোদাই করতে গেলে তা বারবার ভেঙে যাচ্ছে । রাজা খুব চিন্তায় পড়ে গেলেন। ঠিক তখনই তার কাছে এলেন অনন্ত মহারানা নামের এক সুতোর। অনেকের মতে শ্রী হরি নিজেই এসেছিলেন সুতোর হয়ে আবার মতান্তরে অনেকে বলে থাকেন বিশ্বকর্মা এসেছিলেন ভগবানের আদেশ।

তিনি বলেছিলেন কাঠ খোদাই করে গড়ে দেবেন নীলমাধবের বিগ্রহ কিন্তু তার একটি শর্ত হলো ২১ দিনের মধ্যে কেউ মন্দিরে প্রবেশ করতে পারবে না যতক্ষণ না পর্যন্ত  তার খোদাইয়ের কাজ শেষ না হয়। রাজা রাজি হলেন দরজায় পাহারা বসানো হলো কিন্তু বিপত্তি বাধল রানী গুন্ডিচা। তারা অপেক্ষা মান ছিলনা  তিনি ১৪দিনের মাথায় মন্দিরে প্রবেশ করলেন। মন্দিরে ঢুকে তিনি দেখতে পেলেন এক অদ্ভুত দৃশ্য। সেখানে নেই কোন সুতোর অসম্পূর্ণ অবস্থায় জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা দেবীর মূর্তি দেখে তিনি ভিরমি খেলেন।  একি মুর্তি। নীল নবঘন শ্যাম শ্রী বিষ্ণুর এমন গোলাকৃতি নয়ন, হস্তপদ  নেই, কালো মেঘের মতো গাত্র এইসব দেখে রানীর মাথা ঘুরতে লাগলো।

রাজা শুনে ছুটে এলেন। রাণির  উপর অখুশী হলেন এবং বললেন শর্ত ভঙ্গের কারণে অসম্পূর্ণ রেখে তিনি চলে গেছেন। বিমর্ষ হয়ে পড়লেন রাজা। কিন্তু ভক্তের কষ্ট ভগবান সইবেন কেন। সেই রাত্রে রাজাকে আবার স্বপ্নে দেখা দিলেন বললেন তিনি এ রূপে পূজিত হবেন। তার নিজস্ব কোন আকার বা আকৃতি নেই। ভক্তরা তাকে যে রূপে কল্পনা করেন তিনি সেই রুপেরই। তারপর  রাজা সেই মুর্তিকেই  তার মন্দিরের প্রতিষ্ঠা করেন।

জগন্নাথ দেবের প্রধান উৎসব হলো রথযাত্রা। পুরাণ অনুসারে বলা হয়- আষাঢ় মাসের শুক্লা দ্বিতীয়া তিথিতে জগন্নাথ- সুভদ্রা- বলরাম রথে চড়ে রাজা হিন্দ্রদ্যুম্নের পত্নী  গুন্ডিচার বাড়ি যেটাকে বলা হয় জগন্নাথের “ মাসির বাড়ি”  এবং ৭ দিন পর সেখান থেকে আবার নিজের মন্দিরে ফিরে আসেন। এভাবে রথে চড়ে যাওয়াকে সোজা রথ বলে এবং ফিরে আসাকে উল্টোরথ বলে।

এভাবেই রথযাত্রা উৎসব যুগ যুগ ধরে পালিত হয়ে আসছে।

 

আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published.

More News Of This Category
জনপ্রিয়
সর্বশেষ